1. poroshbangla@gmail.com : admin :
  2. info@sonalibanglatv.com : sonalibanglatv :
শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০১:৫৬ অপরাহ্ন

করোনা আইসিইউ ফেরত কর্ণেল সোহেল রানার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১

এক জন আইসিইউ ফেরত করোনা পেশেন্ট হিসাবে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা শেয়ার করা প্রয়োজন। সিএমএইচের আকুন্ঠ সেবা নিয়ে লেখবো ভাবলেও থিমটা চেঞ্জ করলাম কারন সামনে হয়তো আরো খারাপ দিন আসছে এবং আমার পরামর্শ দু একজনের কাজে লাগলেই আমি সন্তুষ্ট।


শুরুতে দুইটা কথাঃ
১। যা লিখছি তার ভিত্তি হচ্ছে আমার নিজের পড়াশুনা, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে ইন্টারনেট সুত্রে পাওয়া জ্ঞান এবং সিএমএইচের আইসিইউ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা। এছাড়া আরো আছে ইন্তেকাল করা আমার পরিচিতদের ব্যাপারে পাওয়া তথ্য এবং আইসিইউ প্রধান ব্রিগেডিয়ার মাসুদ মজুমদারের সাথে কথোপকথন।
২। পোস্টটা সম্পুর্ন করোনা পেশেন্টের দৃষ্টি থেকে লেখা। তাই এর মাঝে ডাক্তারী ভাষ্য, ঔষধের নাম খোঁজা ঠিক হবে না। আর সবকিছুর মালিক আল্লাহ্‌। তাই লেখাটায় ধর্মীয় ভাবাবহ খুজবেন না।


মুল কথায় আসি।
১। করোনা একটা অদ্ভুত রোগ। কে, কখন, কিভাবে এবং কোন স্টেজে তা কখনোই বুঝতে পারবেন না। এটা এমন না যে দুপুরে চটপটি খেয়েছেন আর বিকাল থেকে আপনার পেটে ট্রাবল হচ্ছে। আরো ভয়ংকর হচ্ছে করোনা কার কি এবং কতটা ক্ষতি করবে তাঁর নিশ্চয়তা নেই। কোভিড নেগেটিভ রোগিরা হর হামেশা মারা যাচ্ছেন।


২। শুনেছি হরেক পদের করোনা ভাইরাস বাজারে বিদ্যমান। হালের পশ্চিমবঙ্গের “থার্ড মিউটেশন” করা করোনা আরো বিধ্বংসী। কোন টিকা কাজে আসছে না। তো বিভিন্ন পদের এই ভাইরাস আপনার শরীরের ঢুকে কখন আপনাকে ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা টেরই পাবেন না। ততক্ষনে ভেন্টিলেশন-লাইফ সাপোর্ট- কার্ডিয়াক এরেস্ট এবং শেষ বিদায়। সুতরাং আপনাকে ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিতে হবে। এর উদাহরন আমি একটু পরে দিচ্ছি।


৩। করোনার কোন চিকিৎসা নাই। মানে পৃথিবীতে আবিস্কৃত হয় নাই। যা হচ্ছে তা অন্ধের মত চিকিৎসা করা। পজিটিভ হবার পর থেকে ভেন্টিলেশনে যাবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত যত ঔষধ ও ইঞ্জেকশন পুশ করা হবে সবই আপনার মুল্যবান ফুসফুস কে করোনার আক্রমন থেকে বাচানোর জন্য। একদম ডিফেন্সিভ এপ্রোচ। প্রথমত শরীরে করোনা বিস্তার কমানো এবং ২য়ত ফুসফুস সেভ করা। কম বেশী সবার ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্থ হয় (অস্থায়ী/স্থায়ী) এবং এজন্য পজিটিভ হবার শুরুতে সিটি স্ক্যান জরুরী (কিছুটা ব্যয়বহুল)।

৪। করোনা দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে। তাতে আজ হোক কাল হোক সবাইকে এটার স্বাদ পাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যাদের এখনো হয়নি তাদের জন্য আমার এই লেখনি।


আমার অভিজ্ঞতাঃ
১। করোনা হলে হাসপাতালের একমাত্র সুবিধা বিরামহীন অক্সিজেন সাপ্লাই। আর ক্রিটিক্যাল হলে আইসিইউ এর সিরিয়াল আগে পাওয়া। তাই এক হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আরেক হাসপাতালে নেবার মানে হয় না। যেখানে যাচ্ছেন সেখানে টাকা দিয়েও শুধু অক্সিজেন সাপ্লাইটা নাও পেতে পারেন। তবে হ্যাঁ। সরকারী হাসপাতালে বিভিন্ন দামী ইঞ্জেকশন নাও পেতে পারেন যেটা প্রাইভেট হাসপাতালে পাবেন।


২। একটা কমন অভিযোগ হলো ডাক্তার আসেন না। কুর্মিটোলা হাস্পাতালে দেখেছি করোনার প্রস্তুতি নিয়ে ওয়ার্ডের একটা একটা রোগি দেখতে দেখতে আমার আম্মার কাছে যখন আসলেন তখন বারোটা। অথচ অনেক রুগী বাকি। তাই আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে। আর করোনা পেশেন্ট দেখার মত ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মী সত্যিই কম। যেমন কম হয় সম্মুখ যুদ্ধে আত্মদানকারী যোদ্ধাদের সংখ্যা। এই বাস্তবতা আপনাকে মানতে হবে।

৩। করোনা হলে ক্রিটিক্যাল পর্যায় যাবার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, আই রিপিট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দায়ী। এর প্রথম উদাহরন আমি নিজে। সিএমএইচে ভর্তি হয়ে কেবিনে দিব্যি আরামে কাটাচ্ছিলাম। সেচুরেশন ৯৪-৯৫। এক ভোরে ঘুম ভেংগে গেলো কারন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সেচুরেশন দেখি ৮৭-৮৫-৮৩ আর অক্সিমিটার ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ করছে। পাশের বেডে ঘুমন্ত আরেক পেশেন্ট (আমার স্ত্রী)র ঘুমের ডিস্টার্ব হবে বলে আমি বারান্দায় গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষন পর আবার ঘুম আসাতে সেই শ্বাস কষ্ট নিয়েই ঘুমিয়ে যাই। সকালে ভালোই ছিলাম। কিন্তু অক্সিমিটারে কি রিডিং এলো জানি না। মুহুর্তেই সিনিয়র অফিসারগন হাজির। স্বয়ং কমান্টডান্ট হাজির। মুহুর্তেই আমি আইসিইউতে। অথচ আমার উচিত ছিল ঐ ভোরে ডিঊটি রত কাউকে ডাকা। এ প্রসংগে আমার তিনজন সহকর্মীর উদাহরন টানছি যারা ইন্তেকাল করেছেন।

তাঁরা তিনজনই প্রচন্ড অবহেলা করেছিলেন নিজেকে নিয়ে। তিন চার দিন কাশি জ্বর লুকিয়েছেন। এক বন্ধু অবসরোত্তর ফর্মালেটিজ নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিলেন যে তার অক্সিজেন লেভেল কখন নেমে গেছে টের পায় নি। বাসায় যখন জ্ঞান হারিয়েছে ততক্ষনে লেট। সিএমএইচ ইমারজেন্সিতেই তাকে ভেন্টিলেশনে নেয়া হয়েছে। আর ফেরেনি। সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের লজ্জা, জড়তা, অন্যকে বিরক্ত না করার মানসিকতা, চাকুরীর প্রতি অতিটান( যা শুধু সেনাবাহিনীতে সম্ভব) ইত্যাদি অনেক নাম না জানা ইস্যু কাজ করে যা একদম ভুল। আমি ভাগ্যবান যে ঐ ভোরে আমি জ্ঞান হারাইনি। আমার সহকর্মীরা দুর্ভাগ্যবান যে তাঁরা জ্ঞান হারিয়েছিলেন। আমি পরিবারের প্রধান হিসাবে ফিরে এসেছি আর তাদের পরিবার কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রধানকে হারিয়ে সারাজীবনের জন্য ভয়ংকর অনিশ্চয়তার সমুদ্রে ডুবে গেছে। এর অর্থ করোনার বিপদজনক সীমারেখাটা খুব চিকন সুতার মতো। এপার আর ওপার। তাই আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন সুতার কোন পারে আপনি থাকবেন।


৪। আইসিইউ তে চিকিৎসা দুটা। গাদা গাদা ইঞ্জেকশন দিয়ে ফুসফুসের সংক্রমন বাচানো আর উপুড় হয়ে শুয়ে থেকে(prone postion) ফুসফুসে অক্সিজেন সাপ্লাই বাড়িয়ে তাকে সচল রাখা। মুলত এটাই মুল চিকিৎসা। প্রথমে অবিশ্বাস্য হলেও জেদের বশে আমি প্রতিদিন ১২-১৮ ঘন্টা উপুড়(prone postion) হয়ে শুয়েছিলাম। শেষের দিকে প্রায় ২৩ ঘন্টা। ফলে আমি দ্রুত রিকভার করেছি (৬ দিনে)। আমার চারপাশে অন্যান্য রোগীগন শারিরিক গঠন, অতিরিক্ত ওজন এবং মানি-না/পারবো না টাইপ জেদের কারনে আরো দীর্ঘ দিন সেখানে ছিলেন। উপুড় হবার মত টোটকা চিকিৎসার কারন খুব সহজ। করোনার কারনে ফুসফুসের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্থ/অকেজো হয়।

এরপর বিভিন্ন ঔষধ ও ইঞ্জেকশনের কারনে ফুসফুস(২ ভাগ) প্রায় তিন কেজি ওজনের হয়। উপুড় হলে ঐ ওজনদার ফুসফুস ফ্রিলি কাজ করতে পারে বলে অক্সিজেন বেশী জেনারেট করতে পারে বা কার্যক্ষমতা বাড়ে। ফলে নাক দিয়ে দেয়া বাহিরের অক্সিজেনের নির্ভরতা আস্তে আস্তে কমে এবং রোগি সুস্থ হয়। কুর্মিটোলা হাসপাতালে আম্মাকে দেখতে যাবার সময় ওয়ার্ডে কাউকেই উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখিনি যদিও অনেকে ছিলেন ক্রিটিকাল রুগী। অথচ এই টোটকা পদ্ধতিই করোনা বিস্তার রোধ করে।


৫। আইসিইউ ত্যাগের আগে সকল স্বাস্থ্যকর্মী আমাকে একে একে এসে অনুরোধ করেছে যেন কেবিনে গিয়ে এক সপ্তাহ আমি একই প্রটোকল ফলো করি। সুস্থ বোধ করলেও এক মুহুর্তের জন্য বিছানা থেকে না নামি বা বাথরুমেও না যাই। তা হলে আবার ব্যাক টু আইসিইউ। আমি তা ফলো করেছি। আমি আইসিইউতে থাকার সময় এক ভদ্রলোক ছিলেন যিনি সুস্থতার দিকে আগাচ্ছিলেন। শেষের দিকে এসব প্রটোকল মানছিলেন না এবং তাকে নিয়ে শেষের দিকে স্বাস্থ্যকর্মীগন ভয়েই থাকতো। একদিন সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে তিনি আইসিইউ থেকে খুব সকালে কাকে যেন ফোন করে গাড়ি আনতে বললেন যে বাসায় যাবেন। কিন্তু তিনি কেবিনে শিফট হলেন। আমি থাকতে থাকতেই ৪/৫ দিন পর তিনি আবার আইসিইউ তে ফেরত গেলেন যেখান থেকে আর ফিরেন নাই। আমার অনেক পরিচিত এবং বয়স্ক আত্মীয় আছেন যারা হাসপাতাল থেকে ছাড়ার পর ডাক্তারের পরামর্শ মানেন নাই। ফলে আবার তাদের আইসিইউ তে ফেরত যেতে হয়েছে।


৬। সিএমএইচ একটি আউটস্টান্ডিং প্রতিষ্ঠান। আইসিইউ তে ঘোরের মধ্যে থেকেও আমি দেখতাম কি পরম মমতায় স্বাস্থ্যকর্মীগন প্রতিটি রোগির সেবা করছেন। গভীর রাতেও তাঁরা ক্রিটিক্যাল রোগিদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার পাশের বেডে ছিলেন সহকর্মী মেজর হাসান ইমাম যিনি প্রায় ৪/৫ দিন আগে থেকেই ভেন্টিলেশনে ছিলেন। তাঁর নিথর দেহ ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অথচ শেষ দিন শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ডাক্তারগন তাকে সেবা করছিলেন আর বিভিন্ন ইঞ্জেকশন পুশ করছিলেন। তাঁর পরিবারের আহাজারির মাঝে যখন লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়া হলো, তখনো সবার মাঝে বেদনা আর কষ্ঠের ছাপ। এরা দীর্ঘ এক বছর ধরে এক নাগাড়ে রিস্কি পরিবেশে কাজ করলেও কারো মাঝে নাই ক্লান্তি বা বিরক্তির ছাপ। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের কন্ঠস্বর প্রায়ই শুনতাম অথচ আমাদের কক্ষ ছাড়াও আরো অনেক গুলো আইসিইউ বা ক্রিটিক্যাল রুগী তিনি হ্যান্ডেল করছিলেন। ক্লিনার আর খাবার সরবরাহকারীদের আন্তরিকতা ছিল বিয়ন্ড বিজনেস। এমন বিশাল একটা হাসপাতাল নিখুঁতভাবে চালানোর জন্য এর পেছনের কারিগর দের অবদান অসামান্য যার প্রতিদান আল্লাহ্‌ দেবেন বলে আমার বিশ্বাস।


দীর্ঘ লেখার সারমর্মঃ
১। করোনা আক্রমনের জন্য প্রস্তুত থাকুন এবং খুব সহজে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে একে প্রতিহত করুন।


২। অবশ্যই বাসায় অক্সিমিটার রাখবেন এবং অক্সিজেন লেভেল চেক করবেন।এটা ৯৩-৯২ এর দিকে আসলে সোজা হাসপাতালে যাবেন।

৩। করোনা হলে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাববেন। নিজেকে রক্ষা করবেন। তাহলেই আপনার পরিবার রক্ষা পাবে। আপনি মারা গেলে কেউ দেখতে আসবে না। জানাজা-কবর তো দুরের কথা।লাজ-লজ্জা-ভয় বা জেদের আশ্রয় নিয়েছেন তো আপনি সুতার ওপারে।


৪। করোনা হলে রিকভারীর একটাই উপায় উপুড় হওয়া বা prone postion. আপনি এটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, কষ্টকর বলতে পারেন বা আর যাই বলেন।

৫। করোনাকালীন এবং পরবর্তী ১০ দিন খুব সাবধানে থাকবেন। নিশ্বাসের বিভিন্ন এক্সারসাইজ আছে। ১০ মিনিট করে দিনে তিন চারবার করবেন।


৬। আই সি ইউ সময় টা আমি শুধু সুরা ফাতিহা পড়েছি এবং এক ধরনের শক্তি অনুভব করেছি। অন্যের জন্য দোয়া করবেন। এটা খুব ফলপ্রসু।

৭। করোনার জন্য সরকারী সব আদেশ মেনে চলুন। করোনার পর সারা বিশ্বে একধরনের নুতন সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর সাথে অভ্যস্থ হয়ে নিন। আগের বিশ্ব আর ফিরবে না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved Sonali Bangla Tv 2020 - 2021
Develper By : Porosh Network Ltd